ছায়ানট

পূর্ব বাংলায় বর্তমানে একটি অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ রচিত হয়েছে বলে আমবা অনেক সময়েই দাবি করি এবং গর্বিত হই। কোনো একজন মানুষ অথবা একটি প্রতিষ্ঠানের নয় বরং বহুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির এ রূপান্তর ঘটতে পেরেছে। সরকারি প্রতিকূলতা কী করে একটি মহৎ কাজে অন্যথায় নিষ্ক্রিয় মানুষকে সকর্মক করে তুলতে পারে, তার চমৎকার দৃষ্টান্ত দেখতে পাই রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উৎসবকে কেন্দ্র করে। বাঙালি সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণরূপে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা তখনো যথেষ্ট ছিলেন না পূর্ব বাংলায়। তবু অনেকেই ছিলেন। এরা শতবার্ষিকীর কিছুকাল আগে ঠিক করেন যে, সাড়ম্বরে তাঁরা শতবর্ষ পূর্তি উৎসব পালন করবেন রাজধানী ঢাকাতে। জাস্টিস মুরশেদ, প্রেস ক্লাব ও বেগম সুফিয়া কামালের নামে এরা তিনটি কমিটি গঠন করেন। এই তিনটি কমিটি একযোগে কিন্তু আলাদা আলাদা নামে এগারো দিন ধরে এই উৎসব পালন করেন। পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানটি হয় জাস্টিস মুরশেদের কমিটির নামে। পরিচালকরা আশা করেছিলেন, একজন জাস্টিসের নাম জড়িত থাকায় পুলিশ নিশ্চয় তাঁদের ঘাটাবে না। পরের দুদিন অনুষ্ঠান হয় প্রেস ক্লাবের নামে। তার পেছনেও ছিলো একই আশা। হয়তো প্রেসকে সরকার চটাবে না। শেষের আট দিন অনুষ্ঠান হয় বেগম সুফিয়া কামাল পরিচালিত কমিটির।

এই এগারো দিনের অনুষ্ঠানে মোট আড়াইশ রবীন্দ্রসঙ্গীত গীত হয় এবং চারটি নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করা হয়। নৃত্য পরিচালনা করেন ভক্তিময় দাস; গান ওয়াহিদুল হক এবং বক্তৃতা ইত্যাদি আতিকুল ইসলাম। প্রায় একশ শিল্পী এতে অংশ গ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানের মাস খানেক পরে একদিন শিল্পীরা জয়দেবপুরে একটি বনভোজনে মিলিত হন। সেখানে তাঁরা স্থির করেন যে, তাঁদের উদ্যমকে তাঁরা মরে যেতে দেবেন না বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সংগঠনে তারা দেশজ সংস্কৃতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন এবং সে সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ দেবেন। তাঁরা শুধু সঙ্গীতনৃত্যের চর্চায় লিপ্ত থাকতে চাননি—সামগ্রিকভাবে বাঙালি সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন ও পরিচর্যাই ছিলো তাদের লক্ষ্য। এমনি করেই ‘ছায়ানটে’র জন্ম হয়েছিলো। পরের বছর পয়লা বৈশাখ তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সঙ্গীতবিদ্যালয় চালু করেন।

ছায়ানটগোষ্ঠীর কর্ণধার হলেন ওয়াহিদুলদম্পতি—ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুন। এরা যেহেতু উভয়েই সঙ্গীতশিল্পী, হয়তো সে কারণে ছায়ানটে সঙ্গীতই প্রাধান্য লাভ করেছিলো। ঢাকায় রবীন্দ্রসঙ্গাতকে প্রচার ও জনপ্রিয় করেন, বলতে গেলে, ছায়ানটই। বস্তুত পক্ষে, এরা একই সঙ্গে শিল্পী ও শ্রোতাদের শিক্ষিত করে তোলেন। এমন কি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের সঙ্গীত সমালোচনা যাতে উন্নত মানের হয়, তার জন্যেও ছায়ানট সপ্তাহে একদিন ক্লাসের ব্যবস্থা করেন। ‘শ্রোতাদের আসর’ নামে এরা বর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসব ও বসন্তোৎসব এই চারটি অনুষ্ঠান করতেন। মঞ্চপরিকল্পনা, শিল্পী ও শ্রোতাদের আসনের বিশেষ ব্যবস্থা, সঙ্গীত-পরিবেশন পদ্ধতি সব কিছু মিলে এদের অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা ছিলো অভিনব ও অনুকরণীয়। খোলা মাঠের নীচে, কোনো ঝিলের তীরে বসে এক শারদপ্রাতে যখন ছায়ানটের সঙ্গে রাত পোহাতো, তখন তা জীবনের স্মরণীয় ঘটনা হয়ে উঠতো। কিন্তু এদের সহজ সুন্দর বাঙালি অনুষ্ঠান দেখে আর পরিবেশিত মুড়কি খেয়ে ধর্মান্ধ সাংবাদিক নির্ভেজাল হিন্দুয়ানি বলে উচ্চকণ্ঠে তাকে ধিক্কার না দিয়ে পারেননি।

শতবার্ষিকীর সময়েই এই গোষ্ঠীর শিল্পীরা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি প্রচার করেন। সেই থেকে বারংবার ছায়ানট এ গানটি পরিবেশন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত এ গান বাংলা দেশের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ যেহেতু বঙ্গ-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং যেহেতু তিনি ছিলেন সরকারি রোষের ফোকাল পয়েন্ট, সে কারণে ছায়ানট স্বভাবতই তাঁকে নিয়ে বিপুল উৎসাহ প্রদর্শন করেছেন। ১৯৬৫ সালের বাইশে শ্রাবণ এরা শিলাইদহে গিয়ে সারারাত ধরে অনুষ্ঠান করেছেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী শাহাবুদ্দিন যখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিরুদ্ধে জাতীয় পরিষদে একটি বিবৃতি দান করেন এবং তাঁকে সমর্থন জানান বিভিন্ন স্তরের কিছু সরকারি দালালে, তখন বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষে ছায়ানট বুলবুল

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice